বিধাতার তিনটি অমোঘ বিধান জরা ব্যাধি ও মৃত্যু। বর্তমান যুগে এর সাথে যুক্ত হয়েছে মনুষ্যসৃষ্ট আরেকটি বিধান, যার নাম একাকীত্ব। অসহায় বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি এখনকার বহু সন্তান দায়িত্ব ও কর্তব্যে উদাসীন। জন্মদাতা বাবা-মাকে বার্ধক্যে বোঝাস্বরুপ মনে করে তারা। শেষ জীবনে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যকে সম্বল করে কোনমতে বেঁচে থাকেন অসহায় মানুষগুলি। ইদানিং খবরের কাগজ খুললেই বয়স্ক মানুষ নিগ্রহের খবর, যা পড়ে বিবেকবান মানুষের মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কখনো ছেলে আর ছেলের বউ মিলে ফন্দি এঁটে বৃদ্ধ বাবা-মাকে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে। কখনো বা মেয়ে জামাই বিধবা শাশুড়ির পেনশনের টাকা আত্মসাৎ করে নিচ্ছে। নিজের সন্তানের হাতে নিগ্রহ সহ্য করতে না পেরে অনেক পিতা-মাতা হচ্ছেন ফুটপাতবাসী, একাকীত্বের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে কেউবা বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে বুড়ো বাপ মায়ের আর জায়গা হয় না, তাদের ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে। সারাটা জীবন ধরে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে বড় করে তোলা সন্তানের কাছে এই কি তাদের প্রাপ্য প্রতিদান? কিছু ক্ষেত্রে আইন-আদালত হয়তো সন্তানদেরকে বাবা-মায়ের ভরণপোষণে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের কাছে শুধু ভরণপোষণ চান না, তারা চান একটু ভালোবাসা, কিছুটা মনোযোগ আর অনেকটা সহমর্মিতা।
পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে অন্তঃসারশূন্য ক্ষয়িষ্ণু সমাজব্যবস্থার যূপকাষ্ঠে আমরা আমাদের বিবেককে বলি দিচ্ছি, একথা আমরা আর কবে বুঝতে শিখব? সুখের খোঁজে বিভোর হয়ে থাকা মানুষগুলো নিজেদের অজান্তে কেমন নিষ্ঠুর হয়ে যায়! পার্থিব জগতের চাওয়া-পাওয়ার প্রতি মোহ কিভাবে মানুষকে সহজেই অমানুষ করে তোলে! বৃদ্ধ বাবা-মা ঘুঁটের মত পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে দেখেও মোহাচ্ছন্ন গোবর রুপী সন্তান বুঝতে পারেনা, ভবিষ্যতে তারও একই পরিণতি হবে। নিজেদের অপূর্ণ কামনা-বাসনা সন্তানের মাধ্যমে মেটাতে গিয়ে অজ্ঞাতসারে আমরা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছি পরিবারে। ছেলে মেয়েকে সবার সেরা হিসাবে তৈরি করার নেশায় বুঁদ হয়ে আছি আমরা অনেকেই। ভবিষ্যতে তারা হবে এক একজন টাকা রোজগারের মেশিন। বাল্যকাল থেকে শিশুমনে বপন করে দিচ্ছি আত্মকেন্দ্রিকতার বীজ। পরিবারে স্বার্থের সংঘাত দেখতে দেখতে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে কৈশোর মন। সমাজ ও সংসারে অশ্রদ্ধা, অপমান, হিংসা, ঘৃণা আর অপ্রীতিকর আচরণ সহ্য করতে করতে আমাদের অনেকের হৃদয়ের স্পর্শকাতর জায়গাগুলি অসাড় হয়ে যাচ্ছে।
আত্মসর্বস্ব পৃথিবীতে বয়স্ক ও প্রবীনদের প্রতি অমানবিক আচরণ আসলে যান্ত্রিক সভ্যতার সংকট থেকে উৎসারিত। যার যাঁতাকলে পড়ে আমাদের নীতিজ্ঞান, স্নেহ-ভালোবাসা, বিবেক বিবেচনা ও কর্তব্যবোধের মতো সংবেদনশীল মানবধর্ম লোপ পেতে বসেছে। তাই এখন জীবনে নৈতিক মূল্যবোধের চর্চাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই অমানবিক মানসিকতা থেকে উত্তরনের পথ খুঁজতে হবে সবাইকে। কারণ, বিশ্বের সব সংস্কৃতি সবসময় বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়।



